123 Main Street, New York, NY 10001

দেশের সাধারণ মানুষ যখন দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা, ঠিক তখনই

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নতুন করে মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনজীবনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি

করেছে। এমন এক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯

লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল এক জাতীয় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের

প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হওয়ায় এটি নিয়ে প্রত্যাশা অনেক থাকলেও বাস্তব চিত্র বেশ

জটিল। অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেট বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হবে

লাগামহীন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা, বিশাল অংকের বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণ পরিশোধের

চাপ সামলানো এবং মন্থর হয়ে পড়া অর্থনীতিতে পুনরায় গতি ফিরিয়ে আনা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্য দেশের অর্থনৈতিক সংকটের

তীব্রতা স্পষ্ট করে তুলেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতি ৮

দশমিক ৭১ শতাংশ থাকলেও মাত্র এক মাসের ব্যবধানে এপ্রিলে তা বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে

দাঁড়িয়েছে। সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে

আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও বর্তমান পরিস্থিতি সেই লক্ষ্য অর্জনকে অত্যন্ত

চ্যালেঞ্জিং করে তুলেছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতা,

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ডলারের বিপরীতে টাকার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন আমদানি

ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে দেশের স্থানীয়

বাজারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কেবল নির্দিষ্ট একটি

খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি পুরো অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ‘চেইন রিঅ্যাকশন’

বা ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, যখনই

জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়, তখন কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প কারখানা,

পরিবহন ব্যবস্থা, পণ্য বিপণন এবং সেবা খাতের খরচ একযোগে বেড়ে যায়। উৎপাদক ও

সরবরাহকারীরা তাদের এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে

দেন। এর ফলে বাজারে প্রতিটি পণ্য ও সেবার মূল্য পুনরায় বৃদ্ধি পায়, যা মধ্যবিত্ত ও

নিম্নবিত্ত মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ায় শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার

ক্ষমতা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি

রপ্তানি বাজারেও দেশের উদ্যোক্তারা পিছিয়ে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করছেন। একই সাথে

পরিবহণ খাতের ব্যয় বৃদ্ধি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

সেচ কাজে ব্যবহৃত জ্বালানির দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা

রয়েছে, যা পরোক্ষভাবে খাদ্য নিরাপত্তার জন্য নতুন হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সার্বিকভাবে এই পরিস্থিতি দেশের প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যমাত্রাকেও

বাধাগ্রস্ত করছে।

সব মিলিয়ে বাজেট ঘোষণার আগে এক গভীর অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে

সরকারকে। একদিকে উন্নয়নের গতি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ

প্রশমনে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা—সব মিলিয়ে নীতিনির্ধারকদের

অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পা ফেলতে হচ্ছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমিয়ে আনতে

এবং সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আসন্ন বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট ও

কার্যকর সমাধান থাকবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, কার্যকর

কৃচ্ছ্রসাধন এবং সঠিক রাজস্ব নীতি গ্রহণ ছাড়া এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *