123 Main Street, New York, NY 10001

বিগত এক শতাব্দী ধরে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ‘জ্বালানি

তেল’ অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভূমিকা পালন করে আসছে। তেলের নিয়ন্ত্রণ ও দখলকে কেন্দ্র করেই

আবর্তিত হয়েছে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বড় বড় চুক্তি এবং বিধ্বংসী যুদ্ধ। তবে

সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে তেলের সেই একচ্ছত্র আধিপত্যের জায়গায় উঠে আসছে ‘পানি’। বিশেষ

করে বিশুদ্ধ পানির ক্রমবর্ধমান সংকট ভবিষ্যৎ বিশ্বে পানির অধিকার বা ‘ওয়াটার

রাইটস’কে সবচেয়ে মূল্যবান অর্থনৈতিক সম্পদে পরিণত করতে পারে বলে মনে করছেন

বিশেষজ্ঞরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনালের এক বিশ্লেষণে এই

তথ্য উঠে এসেছে।

আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজার কৌশলবিদ আমরো জাকারিয়া এ প্রসঙ্গে জানান, “একবিংশ

শতাব্দীতে তেলের স্থান দখল করতে যাচ্ছে পানি।” বিশ্বজুড়ে শিল্পায়ন, কৃষি ও

প্রযুক্তির প্রসারে পানির চাহিদা ক্রমাগত বাড়লেও জলবায়ু পরিবর্তন ও দীর্ঘমেয়াদী

খরার কারণে পানির প্রাকৃতিক উৎসগুলো সংকুচিত হয়ে আসছে। ফলে রাষ্ট্রগুলো এখন পানিকে

কেবল জনসেবামূলক সাধারণ উপাদান হিসেবে না দেখে একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা

করতে শুরু করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, পানির কোনো বিকল্প না থাকায় একবিংশ শতকের

অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতিতে এর গুরুত্ব তেলের চেয়েও বেশি হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা পানির চাহিদাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

একটি আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ লিটার অতিশুদ্ধ

পানির প্রয়োজন হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ হাজার পরিবারের দৈনিক চাহিদার সমান।

বিশ্বের শীর্ষ চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি ২০২৩ সালেই প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ

ঘনমিটার পানি ব্যবহার করেছে এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ এই খাতের পানির চাহিদা দ্বিগুণ হতে

পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া ২০৩০ সাল নাগাদ ডেটা সেন্টারগুলোর পানির ব্যবহার

বেড়ে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন লিটারে পৌঁছাতে পারে। অন্যদিকে, এখনো বিশ্বের মোট পানির

প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে কৃষি খাতে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বিশুদ্ধ পানির চাহিদা সরবরাহের তুলনায়

৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট সতর্ক করেছে যে, ২০৫০ সালের

মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো চরম পানি সংকটে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে

২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পানি সেবা খাতের বাজার ১ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে

বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার বড় অংশ জুড়ে থাকবে পানির অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও আর্থিক

সেবা।

তেল বা স্বর্ণের মতো পানির কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববাজার এখনো গড়ে না উঠলেও অনেক দেশে

এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব দ্রুত বাড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকায় ইতোমধ্যে

বছরে প্রায় ৪০০ কোটি অস্ট্রেলিয়ান ডলারের পানি লেনদেন হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের

পশ্চিমাঞ্চলেও কৃষি ও শিল্পের জন্য পানির পৃথক বাজার তৈরি হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ায়

চিপ নির্মাণে ব্যবহৃত এক একর-ফুট পানি থেকে যে রাজস্ব অর্জিত হয়, তা তুলা চাষের

তুলনায় বহুগুণ বেশি। এই ব্যাপক পার্থক্যের কারণেই পানির অধিকার এখন ভূমি উন্নয়নের

অধিকারের মতোই মূল্যবান সম্পদে পরিণত হচ্ছে।

বিদ্যমান সংকট মোকাবিলায় বিশ্বজুড়ে পানি অবকাঠামোতে বিপুল বিনিয়োগ শুরু হয়েছে।

উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলো এই খাতে ৭ হাজার ৬০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের

পরিকল্পনা করেছে। পানির এই ঘাটতি এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত

হানছে। ২০২৩ সালে মরক্কোয় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় কৃষিপণ্য উৎপাদন ২০ শতাংশ কমে যায় এবং

তিউনিসিয়ায় শস্য উৎপাদন প্রায় ৮০ শতাংশ ধসে পড়ে, যা দেশগুলোর আমদানিনির্ভরতা

বাড়িয়ে দিয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *