123 Main Street, New York, NY 10001

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির জেরে পারস্য উপসাগরে বর্তমানে এক

নজিরবিহীন মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। ইরানের কঠোর অবরোধের মুখে

কৌশলগতভাবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালি’তে বর্তমানে ৩২০টি তেল

ও গ্যাস ট্যাঙ্কারসহ অন্তত ২ হাজার ১৯০টি বাণিজ্যিক জাহাজ আটকা পড়ে আছে। বুধবার

প্রকাশিত সর্বশেষ ম্যারিন ডাটা বা সামুদ্রিক তথ্যানুযায়ী, এসব জাহাজ পারস্য

উপসাগরের মূল কেন্দ্রে এমনভাবে আটকা পড়েছে যে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সব পথ এখন

প্রায় রুদ্ধ। বিশ্ব বাণিজ্যের এই লাইফলাইন কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে

বড় ধরণের ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা ‘কেপলার’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অবরুদ্ধ এই জাহাজগুলোর

মধ্যে ৫০টি বিশাল অপরিশোধিত তেলবাহী এবং ১২টি তরল গ্যাস বা এলএনজি পরিবাহী বড় জাহাজ

রয়েছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি

বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করলেও গত ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৬টি জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করতে

পেরেছে। বর্তমানে এই সমুদ্রপথের ওপর ইরানের একক ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ বজায় রয়েছে।

তেহরান কেবল লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে তাদের অনুমোদিত একটি অত্যন্ত সংকীর্ণ করিডোর

দিয়ে সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিচ্ছে। তবে এই সুযোগ পেতে প্রতিটি জাহাজকে

প্রায় ২০ লাখ ডলার বা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৪ কোটি টাকা পর্যন্ত ফি দিতে হচ্ছে বলে

গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। জাহাজ চালক ও সংশ্লিষ্টরা এই প্রক্রিয়াকে বিদ্রূপ করে ‘তেহরান

টোল বুথ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

এদিকে, ইরান তাদের এই কঠোর অবস্থানের মাঝেও কিছু নির্দিষ্ট দেশকে বিশেষ সুবিধা

প্রদানের ইঙ্গিত দিয়েছে। তেহরান জানিয়েছে, মালয়েশিয়ার মতো ‘বন্ধুপ্রতিম’

রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে এই বিশাল টোল মওকুফ করা হতে পারে। বর্তমানে মালয়েশিয়ার

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রোনাস’-এর বেশ কিছু জাহাজ ছাড়পত্রের অপেক্ষায় লারাক

দ্বীপের কাছে অবস্থান করছে। অন্যদিকে চীন নিশ্চিত করেছে যে, বিশেষ কূটনৈতিক

সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের অন্তত তিনটি বড় কন্টেইনার জাহাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে হরমুজ

প্রণালি পার হতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া একটি গ্রিক জাহাজ সৌদি আরবের তেল নিয়ে ভারতের

উদ্দেশ্যে এবং ভারতের কয়েকটি এলপিজি পরিবাহী জাহাজ অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে এই পথ

অতিক্রম করেছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে।

অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি এই সংকট এক ভয়াবহ মানবিক রূপ নিয়েছে। উত্তাল সমুদ্রে

বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার নাবিক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সাগরের তলদেশে

মাইন এবং আকাশপথে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে অনেক জাহাজ রাতে তাদের ট্র্যাকার

বা সিগন্যাল বন্ধ করে অত্যন্ত গোপনে পথ চলার চেষ্টা করছে, যা বড় ধরণের দুর্ঘটনার

ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে আটকা থাকায় নাবিকদের রসদ ও মানসিক অবস্থা

নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ

প্রকাশ করেছে।

এই চরম সংকট নিরসনে বিশ্বশক্তিগুলো এখন নড়চড়ে বসেছে। যুক্তরাজ্য ইতিমধ্যে উদ্ভূত

পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৩৫টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠকের আহ্বান

জানিয়েছে। চীন ও পাকিস্তান যৌথভাবে এক বিবৃতিতে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং বাণিজ্যিক

জাহাজগুলোর জন্য নিরাপদ করিডোর নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট

ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এখনো বেশ মারমুখী। বুধবার তিনি পুনরায় ইরানকে এই অবরোধ

তুলে নেওয়ার কড়া নির্দেশ দিয়েছেন। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, ইরান যদি

অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত না করে, তবে তেহরানকে এমন কঠোর সামরিক পদক্ষেপের

মুখোমুখি হতে হবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির এই অচলাবস্থা

এখন বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য এক চরম পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *