123 Main Street, New York, NY 10001

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল কেনার

ক্ষেত্রে ভারতের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা অস্থায়ীভাবে শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত এড়াতে ওয়াশিংটন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র সরকার ৩০ দিনের জন্য ভারতকে এই বিশেষ অনুমতি দিয়েছে, যাতে সমুদ্রে

আটকে থাকা রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল দেশটি কিনতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি

সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এই সিদ্ধান্ত মূলত বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সচল

রাখার উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, এটি তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখতে একটি

‘ইচ্ছাকৃত স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ’।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর হরমুজ প্রণালির আশপাশে লাখ লাখ

ব্যারেল তেল ও গ্যাসবাহী জাহাজ আটকে রয়েছে। ভারত তাদের মোট অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস

আমদানির প্রায় অর্ধেক এই পথ ব্যবহার করে আনে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তেহরান ওই

পথে চলাচলকারী জাহাজে হামলার হুমকি দিয়ে আসছে।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের পর মস্কোর তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

সেই নিষেধাজ্ঞার ফলে অনেক দেশ বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহে বাধ্য হয়। তবে

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে রাশিয়ার

জ্বালানি কেনা বন্ধ করতে ভারতের ওপরও চাপ তৈরি করে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ

ছিল, রাশিয়া তেল বিক্রির অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধের ব্যয়ে ব্যবহার করছে।

স্কট বেসেন্ট বলেন, এই সাময়িক ছাড় রাশিয়ার জন্য বড় আর্থিক সুবিধা তৈরি করবে না।

কারণ এতে কেবল সমুদ্রে আটকে থাকা তেলের লেনদেনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্কট বেসেন্ট বলেন, ‘ইরান বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে

জিম্মি করার যে চেষ্টা করছে, এই সাময়িক ব্যবস্থার ফলে সেই চাপ কিছুটা কমাবে।’

হরমুজ প্রণালির অনিশ্চয়তার কারণে ভারতে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কাও তৈরি

হয়েছিল। দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে, বর্তমানে ভারতের মজুদে অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস

রয়েছে প্রায় ২৫ দিন ব্যবহারের মতো।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, গত শনিবার

শুরু হওয়া ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় ধরে চলতে

পারে।

এই পরিস্থিতিতে ভারতের শীর্ষ গ্যাস আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পেট্রোনেট এলএনজি গত

বুধবার কাতারের সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জিকে জানিয়েছে, তাদের এলএনজি

ট্যাংকার দোহার রাস লাফান টার্মিনালে পৌঁছাতে পারছে না। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা

রয়টার্স জানিয়েছে, ভারতের গ্যাস কর্তৃপক্ষ ও ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন ইতোমধ্যে শিল্প

গ্রাহকদের কাছে গ্যাস সরবরাহ কমাতে শুরু করেছে।

ভারতের মোট অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। এর মধ্যে প্রতিদিন প্রায়

২৫ থেকে ২৭ লাখ ব্যারেল তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে দেশে আসে, যা মোট আমদানির প্রায়

অর্ধেক। এই তেলের বেশিরভাগই আসে ইরাক, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত থেকে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে ভারতে তেলের বড় ধরনের

সরবরাহ সংকট দেখা দিতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে এবং রাজস্বঘাটতিও বৃদ্ধি

পেতে পারে।

বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রধান বিশ্লেষক সুমিত রিতোলিয়া বলেন,

যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া এই ছাড় কার্যকর হলে সমুদ্রে থাকা রাশিয়ার প্রায় ১৪৫ মিলিয়ন

ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ভারতের বন্দরের দিকে

পাঠানো হতে পারে। তবে তিনি বলেন, ‘এই ছাড় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের ওপর

ভারতের কাঠামোগত নির্ভরতায় মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনবে না।’

ভারতের মোট তেল আমদানির প্রায় ২০ শতাংশ আসে রাশিয়া থেকে। বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার

তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এই ছাড় ওয়াশিংটনের নীতিগত অবস্থানে

একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ কিছুদিন আগে রাশিয়ার তেল কেনার

অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ

করেছিলেন। এর মধ্যে রাশিয়া থেকে তেল আমদানির কারণে ২৫ শতাংশ শুল্ক অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ট্রাম্প তখন অভিযোগ করেছিলেন, রাশিয়ার তেল কিনে ভারত ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ

প্রচেষ্টায় অর্থ জোগাতে সহায়তা করছে।

অন্যদিকে ভারত শুরু থেকেই রাশিয়ার তেল কেনার সিদ্ধান্তে অটল ছিল। দেশটির যুক্তি,

বিশাল জনগোষ্ঠীর জ্বালানিচাহিদা মেটাতে এই তেল প্রয়োজন এবং তারা তাদের বাণিজ্যিক

অংশীদারদের সঙ্গে ব্যবসা করার অধিকার রাখে।

তবে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষ দিক থেকে ভারত ধীরে ধীরে

রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল আমদানি কমাতে শুরু করেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল

কেনার পরিমাণ বাড়িয়েছে দেশটি।

গত ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে একটি বাণিজ্যচুক্তির ঘোষণা দেন।

ওই চুক্তির ফলে ভারতের ওপর আরোপিত শুল্ক কমে ১৮ শতাংশে নেমে আসে।

এ বিষয়ে ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, ‘ভারতের

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও

ভেনেজুয়েলা থেকে আরও বেশি তেল কিনতে সম্মত হয়েছেন।’

তবে ভারত কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার তেল আমদানি কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।

দেশটির অবস্থান হলো, অন্য কোনো দেশের নির্দেশে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক নির্ধারিত

হবে না।

সূত্র: বিবিসি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *