ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলা দেশের ২১২টি আসন জয় করে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে, যেখানে তারেক রহমান আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন। এই ঐতিহাসিক বিজয়টি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে নেতা–কর্মীদের দ্বারা, বিশ্লেষকদের মতে। এই জয় শুধুমাত্র এক রাজনৈতিক মোড়ের পরিবর্তনই নয়, বরং এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির সমীকরণ পুনর্নির্ধারণের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ভারত, পাকিস্তান ও চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের নতুন দৌড়ের সূচনা নির্দেশ করে এবং শেখ হাসিনার যুগের অবসান ঘটিয়ে ঢাকাস্থ পররাষ্ট্রনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। খবর לבজাজিরার।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর যখন শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন, তখন দু’দেশের সম্পর্কের মাঝে কিছুটা টানাপোড়েন দেখা দেয়। এরপর ভারত দ্রুত এই পরিস্থিতিতে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। এই বছরের শুরুর দিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ করে এর আন্তরিকতা ও সৌজন্যের নিদর্শন দেখিয়েছেন, যা ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক কূটনৈতিক বার্তা।
জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, নির্বাচিত সরকারটির পক্ষে ভারতিসহ সম্পর্কের ফেরা এক প্রקটিক্যাল চ্যালেঞ্জ, যদিও তা আওয়ামি লীগের সময়ের মতো খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা চাচ্ছে না। তবে বিভিন্ন মতামত রয়েছে যে, তিস্তার পানি বন্টন, সীমান্তে হত্যা ও বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতির মতো বিষয়গুলো এখনও দুই দেশের জন্য বড় সমস্যা রয়ে গেছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন সম্পর্কের দিগন্ত উন্মোচন হচ্ছে এখানে। ভারতের অনিশ্চিত পরিস্থিতির মাঝে পাকিস্তান নতুন সুযোগ দেখছে। ঢাকায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় থেকেই দ্বিপাক্ষিক সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়েছে, ভিসা প্রক্রিয়া সহজতর করা হয়েছে, যা দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন করে সাজিয়ের পথে আনছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি সরকারের আমলে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুতগতিতে এগোতে পারে। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সালমান বশির বলেন, এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের উচিত নীতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পথে শক্তিশালী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান সম্প্রতি বাংলাদেশে তাদের জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান বিক্রির আগ্রহও প্রকাশ করেছে। এসবের মাধ্যমে, মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও চীন আরও কাছাকাছি আসার সম্ভাবনা রুখে দাঁড়িয়েছে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরু হতে পারে এখানে। দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। বাংলাদেশে চীনের বড় ধরনের বিনিয়োগ অব্যাহত রয়েছে, বিশেষ করে ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এর আওতায়। শুক্রবার চীনের দূতাবাস বিএনপিকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছে, তারা নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের এক নতুন অধ্যায় শুরু করতে প্রস্তুত।
অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, বিএনপি সম্ভবত চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করবে, যা পূর্ববর্তী সরকারগুলোতেও দেখা গিয়েছিল। তবে একই সঙ্গে, এমতাবস্থায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতাও করতে হতে পারে, কারণ অনেকে মনে করেন, চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এই অঞ্চলে এক ধরনের উদ্বেগের কারণ।
ঢাকার সামগ্রিক কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারেক রহমান যখন ক্ষমতায় আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন তার সামনে রয়েছে বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ‘মহাশক্তির প্রতিযেগিতা’ মোকাবেলা করার চ্যালেঞ্জ। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ জনগণের কল্যাণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উন্নত আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই নির্বাচনের ফলদলে দক্ষিণ এশিয়া নিজের মতো করে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেছে। তাই ঢাকা এখন চাইবে ভারত ও চীনের মধ্যে সূক্ষ্ম এক আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করতে এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের রফা করার চেষ্টায় থাকবে।