123 Main Street, New York, NY 10001

ইরানের কেন্দ্রস্থলে চলমান যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী তেলের সরবরাহে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এর দাম নাটকীয়ভাবে ওঠানামা করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) জরুরি ভিত্তিতে বাজারে আরও বেশি পরিমাণ মজুত তেল ছাড়ার পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে বুধবার আবারও বৈশ্বিক তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার আতঙ্ক দেখা দেয়।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়, স্পট মার্কেটে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২৮ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ২৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৮ দশমিক ০৮ ডলার। একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ৩৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৩ দশমিক ৮২ ডলারে পৌঁছেছে।

অন্যদিকে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্যানুসারে, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ ঘাটতি মোকাবিলায় আইইএ যে তেল বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা করেছে, তা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের তুলনায় অনেক বেশি হবে। ২০২২ সালে যখন রাশিয়া ইউক্রেনে আক্রমণ শুরু করে, তখন দুই দফায় সদস্য দেশগুলো মোট ১৮ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছিল। তবে এই পরিমাণ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এখন। এর ফলে বাজারে আরও বড় অস্থিতিশীলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও আইইএ বা যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার তেলবাজারে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। ওই দিন ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই উভয় সূচকেই দাম কমে যায় ১১ শতাংশের বেশি, যা ২০২২ সালের পরে এক দিনে সবচেয়ে বড় পতন। এর আগে, সোমবার এক পর্যায়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা গত জুনের পর সর্বোচ্চ।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার চেষ্টা করলে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি আবারো দাবি করেন, দ্রুত যুদ্ধ শেষ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে, আইইএর মজুত তেল ছাড়ার খবর বাজারে প্রভাব ফেলায় তেলের দাম দ্রুত পতনের দিকে চলে আসে।

অন্যদিকে, মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। পেন্টাগন ও স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, চলমান এই সংঘাতে এটিই সবচেয়ে তীব্র হামলা। আমেরিকার কেন্দ্রীয় সেনা কমান্ড জানায়, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ১৬টি নৌযান ধ্বংস করা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, যদি ইরান মাইন স্থাপন করে, তবে তা দ্রুত সরানো জরুরি। তিনি আরও বলেন, প্রয়োজন হলে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য নিরাপত্তা সহায়তা দিতে প্রস্তুত। তবে এখনো সামরিক ঝুঁকি থাকার কারণে, নৌবাহিনী জাহাজের নিরাপত্তায় কোম্পানিগুলোর শঙ্কা প্রকাশ করেছে।

সিডنিভিত্তিক বিশ্লেষক টনি সাইকামো এক প্রতিবেদনে বলেছেন, ভবিষ্যতে তথ্য অনুযায়ী তেলের বাজার অস্থির থাকতে পারে। তিনি মনে করেন, ব্যারেলপ্রতি ৭৫ থেকে ১০৫ ডলারের মধ্যে দাম ওঠানামা করতে পারে।

প্রগতিপ্রসূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে তেল মজুত ছাড়ার ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়েছে। G-7 দেশের প্রতিনিধিরা অনলাইনে বৈঠক করে এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁও জি-৭ নেতাদের সঙ্গে ভিডিও কলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব ও করণীয় নিয়ে আলোচনা করবেন।

এদিকে, ড্রোন হামলার পর এক স্থাপনায় অগ্নিকা-র সৃষ্টি হয় এবং আবুধাবি ভিত্তিক অ্যাডনক রুইস শোধনাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। চলমান এই যুদ্ধের মধ্যে এটি নতুন করে স্পষ্ট হলো যে, তেল শোধনাগারও হামলার মুখে পড়ছে।

বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব লোহিত সাগর পথে সরবরাহ সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। তবে জাহাজ চলাচলের তথ্য পরিস্থিতি বলছে, হরমুজ প্রণালী থেকেই সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা সমাধানে এই পরিকল্পনা যথেষ্ট নয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন অনুসারে, যুদ্ধের কারণে প্রতিবেশী ইরাক, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ইতিমধ্যে তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে বড় ধরনের উৎপাদন ক্ষতিপূরণের জন্য সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের ওপর নির্ভর করে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

উড ম্যাকেঞ্জির প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ব্যারেল তেল ও তেলজাত পণ্য সরবরাহ কমে যাচ্ছে। এর ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে, মরগ্যান স্ট্যানলি জানিয়েছে, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও জ্বালানি বাজারে বিঘ্ন আরও কয়েক সপ্তাহ অব্যাহত থাকতে পারে।

বাজারের সূত্রগুলো জানায়, উচ্চ চাহিদার কারণে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেল, পেট্রল ও ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুত কমেছে। আমেরিকান পেট্রোলিয়াম ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই মজুত কমে যাওয়ার ফলে বাজারে সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

ভোক্তাদের উপর বাড়তি ব্যয় চাপিয়ে দিচ্ছে বিশ্ববাজারের এই অস্থিরতা। ডেনমার্কভিত্তিক শিপিং কোম্পানি মার্সকের প্রধান নির্বাহী ভিনসেন্ট ক্লার্ক বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবহন ব্যয় যত বাড়বে, তা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের কাঁধেই চাপবে। আমাদের প্রচলিত চুক্তিপরিকল্পনায় এর ব্যবস্থা রয়েছে, অর্থাৎ, জ্বালানির দাম যত হাঁকে বা কমে, সেই ক্ষতি ভোক্তাদের উপরই আসবে।’ তাঁর মতে, বর্তমান অস্থির বাজারে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি অপ্রত্যাশিত কিছু নয়। এই কোম্পানি মূলত কনটেইনার পরিবহনে আসামি, যা বিশ্বজুড়ে নানা প্রস্তুতিপণ্য পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *